অনলাইন ডেস্ক: দেশজুড়ে হাম রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সরকারি-বেসরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের চিকিৎসায় পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রোগীর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড বা ক্যাবিনের ব্যবস্থা এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তায় রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় ‘সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম সিস্টেম’ চালু করা। এদিকে হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম উপসর্গ নিয়ে। আর হামে মৃত্যু হয়েছে দুই শিশু। এদিকে হাম প্রতিরোধে দেড় মাস চলা বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি আজ শেষ হচ্ছে।

আলাদা ওয়ার্ড বাধ্যতামূলক : মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কেবিন চালু করতে হবে। আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করতে হবে। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল ও বিকালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের রাউন্ড দিতে হবে। রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি অভিভাবক বা দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারবেন না। পাশাপাশি ভর্তি রোগীদের তথ্য প্রতিদিন এমআইএস সার্ভারে আপলোড করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও আলাদা ওয়ার্ড করার নির্দেশনা : পৃথক নির্দেশনায় বেসরকারি হাসপাতালকে সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় করতে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন অনুযায়ী, সব বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শয্যা দরিদ্র জনগণের জন্য সম্পূর্ণ বিনা ভাড়ায় সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। এই ১০ শতাংশ শয্যার অর্ধেক শয্যা হাম রোগ ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। ভর্তি হওয়া রোগীর সঙ্গে সর্বোচ্চ একজন অভিভাবক বা দর্শনার্থী অবস্থান বা প্রবেশ করতে পারবেন। ভর্তি রোগী সম্পর্কিত তথ্য প্রতিদিন এমআইএস ওয়েবসাইটে (http://surveillance.dghs.gov.bd) দিতে হবে। প্রয়োজনে ০১৭৫৯১১৪৪৮৮ হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করা যেতে পারে। স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে হাম ও সন্দেহজনক রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

চিকিৎসকদের নিরাপত্তায় চালু হচ্ছে ‘জরুরি অ্যালার্ম’ : এদিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তায় রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে ‘সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম সিস্টেম’ চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। মঙ্গলবার তেজগাঁওয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে অনুদান হিসাবে পাওয়া ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য চিকিৎসা যন্ত্রপাতি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ঈদে স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে ১৮ নির্দেশনা : পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিকালীন দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়, ঈদের ছুটির সময় ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত হাসপাতালগুলোয় জরুরি বিভাগ, লেবার রুম, ইমার্জেন্সি ওটি, ল্যাব, সিটিস্ক্যান ও এমআরআই সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হবে। জরুরি বিভাগে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত চিকিৎসক পদায়নের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল বজায় রাখতে ঈদের আগে ও পরে সমন্বয়ের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ছুটি দিতে হবে।
হামে আরও ১১ মৃত্যু : ২৪ ঘণ্টায় আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম উপসর্গ নিয়ে। আর হামে মৃত্যু হয়েছে দুই শিশু। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৪৭৫ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে ৭৭ শিশু হামে মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

অধিদপ্তর জানায়, ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে ৩ জন করে শিশু রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগে একটি করে শিশু মারা গেছে। এ সময় সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৬৪। হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ হাজার ১১৫ শিশু। আর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ১১০ শিশু। এ সময় ৭৩ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
আজ শেষ হচ্ছে বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন : এদিকে হাম প্রতিরোধে দেড় মাস ধরে চলা বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি আজ শেষ হচ্ছে। সরকারে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সংশ্লিষ্টদের দাবি-এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি (১০২ শতাংশ) টিকা দেওয়া হয়েছে। দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় এপ্রিলে টিকাদানের বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু হয়। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়া। ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। এরপর ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। সারা দেশসহ বাকি সিটি করপোরেশনে টিকা দেওয়া শুরু হয় ২০ এপ্রিল। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আজ ২০ মে বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ ১৩ হাজার ৩৩টি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

হাম প্রতিরোধে জামায়াতের ৪ দফা : হামে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে দেশের মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের রক্ষা করতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে ৪ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো-দেশের প্রতিটি অঞ্চলের জন্য অবিলম্বে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে শতভাগ হামের টিকাদান নিশ্চিত করা, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করে জরুরি ওষুধ ও পুষ্টি সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা, দেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে হাম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা ও হাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানান।
Leave a Reply